অর্থ-বাণিজ্য

‘আমরা কী খেয়ে বাঁচব?’

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন ইমন চৌধুরী। আয় সীমিত হওয়ায় অনেক হিসাব-নিকাশ করে চলতে হয় জানিয়ে এ ব্যক্তি নিউজবাংলাকে বলেন, মূল্যের ক্রমশ ঊর্ধ্বগতির কারণে গরুর মাংসের মতো ব্রয়লারও চলে যাচ্ছে নাগালের বাইরে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে শুক্রবার বাজার করতে আসা ইমন বলেন, ‘আমাদের মতো মাসে হিসাব করে চলা মানুষের জন্য গরুর মাংস খাওয়া অনেক আগেই বিলাসিতা হয়েছে। সবশেষ ভরসা ছিল ব্রয়লার মুরগির ওপর। এখন সেটিও আমাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। আমরা কী খেয়ে বাঁচব?’

তিনি বলেন, ‘ইচ্ছা থাকলেও মাছ-মাংস সন্তানের মুখে দিতে পারছি না। হিসাবের বাইরে গিয়ে কিনলে অন্য খরচে টান পড়ছে। সব পণ্যের দাম একসঙ্গে এভাবে বেড়ে যাওয়া আমার জীবনে এই প্রথম দেখছি।’

ইমনের কথার প্রতিফলন পাওয়া গেল কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর বাড্ডা, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, রামপুরা বাজারে, যেগুলোতে মাছ, মাংসের পাশাপাশি বেড়েছে সবজির দামও।

বাজারগুলোতে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ টাকা দরে। খাসির মাংসের দাম প্রতি কেজি ১ হাজার ১০০ টাকা।

মাংসের বাজারে কমছে না উত্তাপ

টানা তিন সপ্তাহ ধরে অস্থির ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি শুক্রবার ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। আর হালিপ্রতি ডিমের দাম ৫০ টাকাই আছে।

গত সপ্তাহে বাজারভেদে ব্রয়লারের কেজি ছিল ২২০ থেকে ২৩০ টাকা।

গরুর মাংসের দামও বেড়েছে বলে জানান ক্রেতা ও বিক্রেতারা।

রামপুরা বাজারের গরুর মাংস বিক্রেতা জমির উদ্দিন বলেন, ‘গত মাসেও গরুর মাংস ৭০০ টাকা কেজি বিক্রি করতে পেরেছি। এখন ৫০ টাকা বাড়তি। সপ্তাহখানেক আগেও ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে বিক্রি করা গেছে। এখন যাচ্ছে না।’

স্বস্তি নেই মাছবাজারে

অপেক্ষাকৃত কম দামি চাষের মাছের দর কেজিতে বেড়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ টাকা। অন্যদিকে ইলিশ, চিংড়ির পাশাপাশি উন্মুক্ত জলাশয়ের মাছগুলোর দাম বেড়েছে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত।

চাষের পাঙাশ, তেলাপিয়া থেকে শুরু করে দেশি প্রজাতির সব ধরনের মাছের দাম বেড়েছে। আগে প্রতি কেজি পাঙাশ বিক্রি হতো ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায়, যা এখন ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে তেলাপিয়া মাছের কেজি হয়েছে ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, যা আগে ছিল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা।

বাড্ডা বাজারে আসা দিনমজুর আকাশ মণ্ডল বলেন, ‘একটা দিন যে ভালো-মন্দ খাব, এখন সেই উপায় নেই। এগুলো দেখার কেউ নেই। আমাদের নিয়ে সরকার ভাবে না।

‘দিনে ৬০০-৭০০ টাকা কামাই। এর মধ্যে যদি ২৫০ টাকায় মাছ কিনি, তাহলে অন্য খরচ কী দিয়ে হবে?’

ওই বাজারের মাছ বিক্রেতা জামাল জানান, তার দোকানে চিংড়ির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়, যা আগে ছিল ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। অন্যান্য চাষের মাছগুলোও বেশ বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

রুই, কাতলা, মৃগেল বিক্রি হচ্ছে ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা কেজিতে, যা আগে ২৮০ থেকে ৩২০ টাকা ছিল। দেশি প্রজাতির টেংরা, শিং, গচি, বোয়াল মাছের কেজি ৬৫০ থেকে ৮০০ টাকা, যা আগে ছিল ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকার মধ্যে, তবে এসব মাছ চাষের হলেও কিছুটা কম দামে মিলছে।

তিনি জানান, সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে মাছের বাজারেও। সে কারণে দাম বেড়েছে।

মুদি বাজারেও দাম বাড়তি

সপ্তাহের ব্যবধানে নতুন করে বেড়েছে ডাল ও ছোলার দাম। প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১০৫ টাকা দরে, যা গত সপ্তাহে ৯০ থেকে ৯৫ টাকা ছিল। একইভাবে কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে বুটের ডাল ৯৫-১০০ এবং মাসকলাইয়ের ডাল ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে।

উত্তাপ সবজির বাজারেও

কিছু সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। অন্য কিছু সবজির দর বেশ চড়া।

প্রতি কেজি বেগুন ৮০ টাকা, করলা ১২০ টাকা, বরবটি ১২০ টাকা, পটল ১২০ টাকা, ঝিঙা ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

প্রতি কেজি আদা বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ১৪০ থেকে ২৮০ টাকায়। রসুনের কেজি ১৬০ থেকে ২২০ টাকা।

কষ্টে মধ্যবিত্ত

কারওয়ান বাজার ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে বাজার করতে আসা বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার। তাদের বেশির ভাগই জানান, তারা মধ্যবিত্ত। বাজারের প্রায় সব পণ্যের চড়া দামে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন।

শাহিন খান নামের এক চাকরিজীবী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার মতো যারা মধ্যবিত্ত, কষ্টটা তাদেরই বেশি। একসাথে সবকিছুর দাম এতটা বেড়ে যাওয়া যেন আমাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। না পারছি কিছু ভালোমতো কিনতে, না পারছি না খেয়ে থাকতে।’

তিনি বলেন, ‘যারা একেবারে গরিব তারা আমাদের চেয়ে ভালো আছেন। অন্তত মানুষের কাছে হাত পেতে হলেও ভালো-মন্দ খেয়ে চলতে পারছেন। আমাদের তো তা-ও করার জো নেই।

‘আর বড়লোকদের কথা তো বলে লাভই নেই। উনাদের এসবের দাম বাড়া-কমা নিয়ে কোনো চিন্তাই নেই।’

Related posts

৪ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স ফেব্রুয়ারিতে

admin

৪৬.৩ মিলিয়ন ডলার ক্লাউড পরিষেবার মার্কেট হবে ২০২৫ সালে

Rubaiya Tasnim

কানাডার সংবাদ প্রকাশকদের অর্থ দেবে গুগল

Rubaiya Tasnim

Leave a Comment