বাংলাদেশে

শিশুর প্রতি সহিংসতা বাল্যবিয়ে ঠেকাতে সোচ্চার ওরা

তখন তার বয়স মাত্র ১৪ বছর। নবম শ্রেণির ছাত্রী। এক ঘটকের প্ররোচনায় বাবা-মা তাকে শিশু বয়সেই বিয়ে দিতে চান। বিয়েতে সম্মতি না দেওয়ায় ঘরবন্দি করে রাখা হয়। এক পর্যায়ে এক প্রতিবেশীর সহযোগিতায় নিজেই রুখে দেন নিজের বাল্যবিয়ে। বলছিলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বিনপাড়া গ্রামের ফাতেমা আক্তারের কথা। নিজের বাল্যবিয়ে রুখে দেওয়া সেই ফাতেমা এখন এলাকায় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কাজ করছেন। যৌতুক, ইভটিজিং, যৌন হয়রানি বন্ধসহ নারী ও শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার তিনি। পড়ালেখা করছেন নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজে অনার্স ১ম বর্ষে। তার স্বপ্ন- পড়ালেখা শেষে সরকারি চাকরি করবেন, পরিবারের হাল ধরবেন। তার এমন সচেতনতামূলক কর্মকা-ে এখন তার পরিবারও খুশি, গর্ব করেন মেয়েকে নিয়ে।
শুধু ফাতেমা নয়; তার মতো একদল তরুণ-তরুণী মানুষের আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে নারী ও শিশুদের কল্যাণে কাজ করছেন। একটি প্রকল্পের মাধ্যমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ, কুড়িগ্রামের সদর ও রাজারহাট এবং গাইবান্ধা সদর ও ফুলছড়ি উপজেলার স্কুল-কলেজে পড়ুয়া এই শিশু-কিশোর-যুবকেরা নারী ও শিশুর প্রতি যে কোনো ধরনের সহিংসতা ও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সোচ্চার। তারা স্কুল-কলেজে, খেলার মাঠে, কমিউনিটিতে এমনকি প্রতিবেশী প্রত্যেককে এসবের কুফল তুলে ধরার মাধ্যমে গণসচেতনতা সৃষ্টি করছে।

বাল্যবিয়ের সম্ভাবনা রয়েছে এমন শিশুদের তালিকা করে কাউন্সেলিং করছে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের সঙ্গেও কাজ করছে। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে ছয়টি উপজেলায় ৬৮টি বাল্যবিয়ে বন্ধে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে তরুণরা। তাদের এই অবদান যেমন প্রত্যেকটি মহলে সাড়া জাগিয়েছে, তদ্রƒপ আগামী দিনে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে আরও বেশি সহায়ক হবে। স্থানীয় অভিভাবকরা এখন বাল্যবিয়ে নিয়ে সচেতন, সচেতন মেয়ে শিশুরাও।
গত মঙ্গলবার এসব উপজেলায় সরজমিনে ঘুরে তরুণ-তরুণীদের এমন সচেতনতামূলক কর্মকা- দেখা গেছে। বাল্যবিয়ে ও শিশুদের প্রতি সহিংসতাসহ ক্ষতিকারক সামাজিক প্রথা প্রতিরোধে এবং শিশু-কিশোর-কিশোরীদের জীবনমান উন্নয়নে ইউনিসেফ ও ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের সহযোগিতায় এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার মোট ছয়টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করছে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ।
এ বিষয়ে ইউনিসেফ রংপুর ও রাজশাহী বিভাগীয় প্রধান এএইচ তৌফিক আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী অপূর্ব প্রাণশক্তির অধিকারী এবং সৃষ্টিশীল। এদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ইউনিসেফ সমাজে ইতিবাচক আচরণ গড়ে তোলা ও ক্ষতিকর কুপ্রথা বন্ধে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের উন্নয়ন কর্মসূচিতে সত্যিকারের পরিবর্তনের প্রতিনিধি হিসেবে দেখে। দেশের অন্যান্য জায়গার মতো উত্তরাঞ্চলেও ইউনিসেফের কর্মসূচিতে শিশু-কিশোর-কিশোরী-তরুণদের কার্যকর অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে।
সরেজমিনে গিয়ে স্কুল-কলেজের কোমলমতি তরুণ-তরুণীদের সচেতনতামূলক কার্যক্রমে দেখা যায়, তারা পাড়া-মহল্লায় গিয়ে মানুষকে বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে বোঝাচ্ছে। শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে জনগণকে সচেতন করে তুলছে। তরুণ-তরুণীদের একজন মো. আনোয়ার ইকবাল। শিবগঞ্জ সরকারি হাই স্কুলের ১০ম শ্রেণির ছাত্র। আনোয়ার নিজেই তার বোনের বাল্যবিয়ে রুখে দেয়। কোনো ধরনের সহিংসতা ও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধকল্পে সরকারের হটলাইন নাম্বার ১০৯-এ কল দেয় সে। পরে ওয়ার্ল্ড ভিশন এনজিও এবং ইউনিসেফের দুজন কর্মকর্তা এসে তার বাবা-মাকে বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে বোঝায়। এক পর্যায়ে তার বাবা-মা আর শিশুটিকে অল্প বয়সে বিয়ে দেননি। আনোয়ার জানায়, তারা এসব বিষয়ে বোঝাতে গেলে প্রথমে এলাকার লোকজন রেগে যেত। ভাবত, আমরা তাদের মেয়ের বিয়ে ভাঙতে এসেছি। পরে বাল্যবিয়ের কুফল তুলে ধরলে, ডকুমেন্টারি দেখানোর ফলে অনেক পরিবারে এখন বাল্যবিয়ে বিরোধী মনোভাব এসেছে।
এ সময় একই গ্রামের বাসিন্দা মিনা আহমেদ শিল্পী পাশ থেকে এই প্রতিবেদককে বলেন, এরা (আনোয়ারসহ অন্যরা) সচেতনতামূলক কাজ করায় এলাকায় বাল্যবিয়ে অনেক কমে গেছে।

Related posts

ডা. দীপু মনি : নির্বাচনের জন্য পেছাতে পারে বই উৎসব।

Megh Bristy

রাজনীতি নিয়ে সাকিবের পুরোনো পোস্ট ভাইরাল

Samar Khan

বাবা মাধ্যমিক পরীক্ষার ফি দিয়েছিলেন, টাকা ধার করে

Asma Akter

Leave a Comment