লাইফ স্টাইল

তিন ভাইবোনই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও ছুটে চলেছেন তাদের স্বপ্ন পূরণে

pickynews24

‘দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়ে জন্মগ্রহণ করায় অনেকের কাছেই শুনতে হয়েছে কটুকথা। গ্রামের পাড়াপ্রতিবেশী আমার বাবাকে বলতেন, তোমার অন্ধ ছেলেকে দিয়ে ভবিষ্যতে কিছুই হবে না। তবে এসব কটুকথায় কখনোই কষ্ট পাইনি বরং চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। সবসময় ভাবতাম সফল হয়ে সমাজকে একটা জবাব দেবো, যে আমরাও পারি। সেই থেকে বুকভরা সাহস আর মনের জোরে শুরু করেছিলাম পড়াশোনা। আমার কঠোর অধ্যাবসায় ও সংগ্রামের ফলে আমি আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছি। চোখে দেখতে পাই না বলে কি আমি স্বপ্ন দেখতে পারবো না?’

কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক অধম্য মেধাবী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ওই শিক্ষার্থীর নাম নাঈম হোসাইন। তিনি লক্ষ্মীপুর জেলার সদর উপজেলার পশ্চিম লক্ষ্মীপুর গ্রামের মো. কবির হোসেনের ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে নাঈম সবার ছোট। বিভিন্ন প্রতিকূলতা পার করে গ্রামের স্কুল থেকে এসএসসি ও লক্ষ্মীপুর পৌর আইডিয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় ৪.২৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন নাঈম। নিজের সঙ্গে সংগ্রাম করে এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত।

নাঈম হাসানরা তিন ভাইবোনই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। শারীরিক প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে তিনজনই ছুটে চলেছেন তাদের স্বপ্ন পূরণে। তিনজনই পড়াশোনা করছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। বড় ভাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। আর বোন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ২০-২১ সেশনে পড়াশোনা করছেন। জন্মের পর থেকেই কেউ কাউকে দেখেননি তারা।

নাঈমের বাবা কবির হোসেন ছিলেন সৌদি প্রবাসী। দুই বছর আগে তিনি দেশে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি দিনমজুর হিসেবে কর্মরত। এখন তিন সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। তবুও সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন এমন স্বপ্ন তার।

নাঈম হোসাইন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের ১৫১ নম্বর রুমের আবাসিক শিক্ষার্থী। নাঈম জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুদের সহযোগিতার চলাফেরা করতে হয় তাকে। মোবাইলে স্ক্রিন রিডার অ্যাপসের মাধ্যমে সবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং মোবাইলে পিডিএফ বই পড়ে থাকেন। একবার কোনো জায়গা দেখিয়ে দিলে দ্বিতীয়বার আর দেখাতে হয় না এই অধম্য মেধাবীকে। খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে সকল কাজ তিনি একা করতে পারেন।

চোখে দেখতে পান না, তবুও কীভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি মোবাইলে স্ক্রিন রিডার অ্যাপসের মাধ্যমে পড়াশোনা করে থাকি। আর পরীক্ষাগুলোতে বিভাগের জুনিয়র কিংবা অন্য বিভাগের বন্ধু বা জুনিয়র কাউকে শ্রুতিলেখক হিসেবে নিয়ে আসি। আমি তাদের মুখে বলি, আর তারা লিখে দেয়। আমার বই পড়তে খুব ভালো লাগে। তাই আমি মোবাইলে পিডিএফের বইগুলো পড়ে থাকি। কিন্তু পিডিএফে সকল বই পাওয়া যায় না, এ বিষয়টি আমাকে খুব কষ্ট দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন সম্পর্কে তিনি বলেন, আমার মা আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন। আর আমার শিক্ষাগুরু বোরহান উদ্দিন ভূইয়া, যিনি আমাকে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। পাশাপাশি এখনো আমি স্যারের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় উপদেশে নিয়ে থাকি। তিনি নিজেও একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। আমার এক বড়ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছিল, তখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। তখন থেকেই নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করি এবং আমার লক্ষ্যই ছিল কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে পড়তে হবে। ভবিষ্যতে নিজেকে কলেজের শিক্ষক হিসেবে দেখতে চাই।

তিনি আরও বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করার স্বপ্ন দেখছি। আল্লাহ সহায় হলে আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করবো ইনশাআল্লাহ।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আসতে কখনো কটুকথা শুনতে হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, গ্রামের প্রতিবেশীরা আমার বাবাকে বলতেন আমাদের দিয়ে ভবিষ্যতে কিছুই হবে না। এমন সব কথায় আমি কখনোই কষ্ট পায়নি, বরং চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। মনে মনে ভাবতাম আমাকে কিছু একটা করতে হবে। আমার কাজের মাধ্যমে সমাজকে দেখাবো, যে আমরাও পারি।

সফল হওয়ার পর পিছিয়ে পড়া মানুষদের নিয়ে কাজ করার ইচ্ছার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমি যদি কখনো প্রতিষ্ঠিত হতে পারি, তাহলে আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমাজে যারা পিছিয়ে পড়া মানুষ আছে তাদের নিয়ে কাজ করতে চাই।

পিছিয়ে পড়া মানুষদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ভেঙে পড়ার কোনো কারণ নেই। আপনার সৃষ্টিকর্তা আপনার পাশে আছেন।

নাঈম হোসাইনের বাবা কবির হোসেন বলেন, আমার ছেলেকে নিয়ে আমি গর্ববোধ করি। আজ আমি একজন সফল বাবা। আমার নাঈম এখন বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। আমার ছেলে এখন এলাকার গৌরব। তার এই সফলতা অন্য পিছিয়ে পড়া ব্যক্তিদের এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আশা করি।

নাঈম হোসাইনের রুমমেট রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন সকালে ক্লাসে যাওয়ার সময় আমরা তাকে হল গেইটে রিকশায় তুলে দিয়ে আসি। হলের ডাইনিং-ক্যান্টিন থেকেও তার জন্য খাবার নিয়ে আসি। নাঈমের বন্ধু-বান্ধব ও জেলা সমিতির সদস্যরা প্রতিনিয়তই তার খোঁজ খবর নিতে রুমে আসেন। পরীক্ষার আগে তার নোটগুলো, আমরা মোবাইলে রেকর্ড করে দেই এবং সে এগুলো শুনে শুনে আয়ত্ত করে পরীক্ষা দেয়। পিছিয়ে পড়া মানুষরাও পারে তার বড় উদাহরণ নাঈম।

ইতিহাস বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. মাহমুদা খাতুন বলেন, নাঈম হোসাইন অসম্ভব মেধাবী একটি ছেলে। জন্ম থেকেই সে অন্ধ, তবুও আল্লাহ তাকে অনেক মেধা দিয়েছেন। বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করি। আমি তাকে ব্যক্তিগতভাবে ক্লাসের বাইরেও নার্সিং করে থাকি। আমি বিশ্বাস করি নাঈম একদিন ভালো কিছু করবে। আমি তার বিভাগের শিক্ষক হিসেবে তাকে নিয়ে গর্ব করি।

Related posts

কাটা তরমুজ ফ্রিজে রাখলে হতে পারে বিপজ্জনক

Asma Akter

ভাতের মাড়ে এক চামচ কফি মিশিয়েই বয়স কমান ১০ বছর

Megh Bristy

হাত-পা অবশ হওয়ার লক্ষণ হতে পারে মারাত্মক।

Asma Akter

Leave a Comment